চীনের বাইরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উপকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ইউরোপ। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের অবস্থা দাঁড়িয়েছিল সবচেয়ে ভয়ানক। তবে পরিস্থিতি বেশ উন্নতির দিকে। বেশি আক্রান্ত দেশগুলোর প্রায় প্রতিটিতে গত রোববার যে মৃত্যু হয়েছে, তা প্রায় দুই মাসে সর্বনিম্ন। একই অবস্থা নতুন রোগী শনাক্তের ক্ষেত্রেও।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ ব্যবসা–বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে খুলতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে হলেও সতর্কতার সঙ্গে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে এগাচ্ছে। সব মিলিয়ে ইউরোপের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলছে।

করোনা মহামারির সার্বক্ষণিক তথ্য প্রকাশ করছে ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফো। এই ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে করোনায় সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৪৮ লাখ ৪৮ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মারা গেছেন প্রায় ৩ লাখ ১৮ হাজার। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৮ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোগী।

বিশ্বের অঞ্চলগুলোর মধ্যে ইউরোপ মহাদেশেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ লাখ করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন পৌনে ৮ লাখ। মারা গেছেন ১ লাখ ৬৩ হাজারের কিছু বেশি।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে প্রথম পরিস্থিতি খারাপ হয় ইতালিতে। এখানে গত ৩১ জানুয়ারি প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হন। ওই দিনই চীনের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় ইতালি। দেশজুড়ে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। এরপরও শেষ রক্ষা হয়নি। দেশের সব অঞ্চলে করোনা ছড়িয়ে পড়লে গত ৯ মার্চ দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয়।

টালমাটাল দুটি মাসের পর অবশেষে চলতি মাসের শুরুর দিক থেকে ইতালিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে। গত রোববার মৃত্যু হয়েছে ১৪৫ জনের। গত ৯ মার্চের পর এদিনই প্রথম দেশটিতে মৃত্যু দেড় শর নিচে নামল। এ নিয়ে ইতালিতে মোট মৃত্যু ৩২ হাজার ছাড়াল। দেশটিতে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২ লাখ ২৫ হাজারের বেশি। মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসার আভাস পেয়ে ইতালির কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করছে। এরই মধ্যে কাজে ফিরেছেন নির্মাণশিল্প ও শিল্পকারখানার কর্মীরা। আর গতকাল সোমবার খুলেছে দোকানপাট, হেয়ারড্রেসার সেলুন আর রেস্তোরাঁগুলো। তবে শর্ত হচ্ছে, সামাজিক দূরত্বের সব নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে সবাইকে। এএফপি জানায়, গতকাল ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকাও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

প্রাণ ফিরেছে ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনেও। দেশেটিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি ও লকডাউনের ঘোষণা আসে গত ১৪ মার্চ। এই দেশটিতেও একটা পর্যায়ে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তবে এপ্রিলের শেষ দিক থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে শুরু করে। রোববার দেশটিতে মারা যান ৮৪ জন। গত ১৬ মার্চের পর এদিনই প্রথম দেশটিতে মৃত্যু ১০০ জনের নিচে নামে। স্পেনে এ পর্যন্ত মৃত্যু ২৭ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত রোগী রয়েছেন ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি।

বিবিসি জানায়, স্পেনের সরকার তিন দফায় বিধিনিষেধ শিথিল করার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রথম দফায় গতকাল থেকে রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতে বসে খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকেরা। তবে রেস্তোরাঁ কিংবা ক্যাফের ভেতরে নয়, বাইরে বসে খাওয়া যাবে। বাড়িতে বা সড়কে সর্বোচ্চ ১০ জন লোক জড়ো হতে পারবেন। ছোট পরিসরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও চালানোর অনুমতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ফ্রান্সেও জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এই দেশটিতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত ২৪ জানুয়ারি। ওই রোগীই ছিলেন ইউরোপের প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনা সংক্রমিত রোগী। মহামারি মোকাবিলায় সরকার মার্চের মাঝামাঝি সময়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়, গণজমায়েত নিষিদ্ধ করে। বন্ধ করে দেওয়া হয় রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, সিনেমা হলসহ সব গণজমায়েতের জায়গা। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। রোববার দেশটিতে ৪৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে তার আগের দুদিন এ সংখ্যা ছিল ১০০ ও ৯০-এর ঘরে। ফ্রান্সে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজারের কিছু বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

জার্মানিতেও মহামারি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। দেশটিতে এরই মধ্যে মাঠে গড়িয়েছে ফুটবল। এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৭ হাজারের কিছু বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন জার্মানিতে। এর মধ্যে মারা গেছেন ৮ হাজার ৭০ জন। সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি।

যুক্তরাজ্যেও মৃত্যু কমে এসেছে। দেশটিতে রোববার মারা গেছেন ১৭০ জন, যা ২৪ মার্চের পর সবচেয়ে কম। মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসার আভাস পেয়ে এই দেশেও বিধিনিষেধ শিথিলের পথে হাঁটছে সরকার।

এ ছাড়া বেলজিয়ামে রোববার মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের, যা গত ২৬ মার্চের পর সর্বনিম্ন। নেদারল্যান্ডসে এদিন মারা গেছেন ১০ জন। এ সংখ্যা গত ১৬ মার্চের পর সবচেয়ে কম। সুইজারল্যান্ডে ২ জন, ১৫ মার্চের পর সর্বনিম্ন।

এএফপি জানায়, রাশিয়ায় গতকাল নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৯২৬ জন। এ নিয়ে দেশটিতে রোগীর সংখ্যা বেড়ে ২ লাখ ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটিতে গতকাল ৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাশিয়ায় করোনায় মোট মারা গেছেন ২ হাজার ৭২২ জন।

ইউরোপের বাইরে করোনা মহামারিতে সবচেয়ে নাকাল যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশটিতে বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছেন, মৃত্যুও হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তবে রোববার যুক্তরাষ্ট্রেও তুলনামূলক মৃত্যু অনেক কম ছিল। এদিন দেশটিতে করোনায় মারা গেছেন ৮৬৫ জন। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু ৯১ হাজার ছাড়িয়েছে। এ পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৫ লাখের বেশি।

Ref: Prothom alo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *