বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’ গর্জন করছে এ মুহূর্তে বাংলাদেশমুখী। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এটি পরিণত হয়েছে সুপার সাইক্লোনে। গতিবেগ বেড়ে হয়েছে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৪৫ কিলোমিটার। ‘আমফান’ ভারতের ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশে আঘাত করতে পারে। এমনকি সরাসরি বাংলাদেশ উপকূলে আঘাতের আশঙ্কাও আছে।
খুলনা-চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী উপক‚লীয় অঞ্চলে আগামীকাল বুধবার আঘাত হানতে পারে সুপার ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’। গতকাল সোমবার সারাদিনে এবং সন্ধ্যা অবধি শক্তি সঞ্চয় করে এটি ভয়াল জোরদার হয়। ফুঁসে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেত এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।
খুলনা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল, চর-দ্বীপাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে এবং একই সময়ে অমাবস্যার প্রভাবে ৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। ‘আমফান’ গতিমুখ ও দিক পরিবর্তন করেই চলেছে। আর বাংলাদেশমুখী গতি নেয়ায় ৭ ও ৬ নম্বর বিপদ সঙ্কেত ঘোষণার পরই করোনা কালে আরও থমকে গেছে দেশের উপকূলের বড় অংশে জনজীবনের স্বাভাবিক গতি। অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দর কার্যক্রম।
ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসরত হাজারো উপক‚লবাসী ছুটতে শুরু করছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। স্বেচ্ছাসেবকগণ হচ্ছেন তৎপর। চসিক, বন্দরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, সেবাসংস্থার উদ্যোগে মহানগরী, জেলা-উপজেলায় খোলা হচ্ছে কন্ট্রোল রুম। আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো উপকূলবাসীর স্থানান্তরের উপায় নিয়ে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছে প্রশাসন।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গতকাল দিনভর উপক‚লীয় অঞ্চলের অনেক জায়গায় গুমোট থমথমে আবহাওয়া বিরাজ করে। আর রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় দেশজুড়ে অসহ্য ভ্যাপসা গরমে তাপদাহে কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ। বিপর্যস্ত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গতকাল ঢাকায় তাপমাত্রা উঠে গেছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৩৭.৮ ডিগ্রি। সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বগুড়ায় ২৪ মিলিমিটার ছাড়া উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি ঝরেনি তেমন কোথাও।
তবে আজ মঙ্গলবার আবহাওয়া পূর্বাভাস মতে, সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি হ্রাস পেতে পারে। ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। সুপার ঘূর্ণিঝড়টির সর্বশেষ গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী, ‘আমফান’ দিক পরিবর্তন করছে। যা বাংলাদেশে আঘাতের শঙ্কা জাগাচ্ছে। রোববার পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’র গতিমুখ ছিল উত্তর, উত্তর-পশ্চিমমুখী। দিক বদল হয়ে গতকাল সকাল থেকে ছিল উত্তরমুখী। পরবর্তীতে ‘আমফান’ ফের দিক পরিবর্তন করে উত্তর, উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখনই আঘাত হানার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে খুলনা-চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী উপকূল বরাবর।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগ বলছে, ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’ পশ্চিমবঙ্গে আঘাত করবে এটা ৭০ ভাগ নিশ্চিত। এরপরই সুন্দরবন অঞ্চলের উপর দিয়ে খুলনা ও দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকা অতিক্রম করতে পারে।
বর্তমান মতিগতি অনুসারে গত বেশ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সমুদ্রে ‘আমফান’ কিছুটা গতিপথ বদল করেই উপক‚লের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গতিপথ ও দিক পরিবর্তন অব্যাহত থাকতে পারে আজ-কালও। আজ মঙ্গলবার দিবাগত শেষ রাত পরদিন বুধবার সুপার ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’ বাংলাদেশ উপক‚লে বিশেষত খুলনা-চট্টগ্রাম বরাবর আছড়ে পড়তে পারে।
গতকাল সন্ধ্যায় আবহাওয়ার সর্বশেষ বিশেষ বুলেটিনে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ জানান, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফান উত্তর দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে সুপার ঘূর্ণিঝড় আকারে বর্তমানে একই এলাকায় রয়েছে। এটি গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে থেকে ১০৪৫ কি.মি. দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৯০ কি.মি. দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে, মংলা বন্দর থেকে ৯৫৫ কিমি দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৯৪০ কি.মি. দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল।
এটি আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং পরবর্তীতে দিক পরিবর্তন করে উত্তর, উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে মঙ্গলবার দিবাগত শেষ রাত থেকে বুধবার বিকেল বা সন্ধ্যায় বাংলাদেশের উপক‚ল অতিক্রম করতে পারে। সুপার ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৯০ কি.মি.র মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘন্টায় ২২৫ কিঃ মিঃ। যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২৪৫ কি.মি. পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সুপার ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের এলাকায় সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে। মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপক‚লীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৬ (ছয়) নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপক‚লীয় জেলা লক্ষীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৬ নম্বর বিপদ সঙ্কেতের আওতায় থাকবে।
ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপক‚লীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম জেলা সমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণসহ ঘন্টায় ১৪০ থেকে ১৬০ কি.মি. বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থারত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্ত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’র সক্রিয় প্রভাবে দেশের বেশিরভাগ জেলায় জ্যৈষ্ঠের তাপদাহে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। সমুদ্র উত্তাল ও বিপদ সঙ্কেত থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজের মালামাল লাইটারিং খালাস, ডেলিভারি পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের দুর্যোগ বিধিমাফিক চট্টগ্রাম বন্দরের স্থাপনাসমূহ ও জাহাজের নিরাপত্তা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে আইএসপিএস কোড অনুসারে আগাম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ছোট জাহাজ নৌযানগুলোকে কর্ণফুলীর উজানের দিকে এবং সামুদ্রিক জাহাজসমূহকে বহির্নোঙরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বন্দরের জেটি-বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো খালি ও নিরাপদ রাখা হয়েছে। করোনায়ও ২৪ ঘণ্টা সচল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর অপারেশনাল কার্যক্রম এখন ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’ দুর্যোগের মুখে আপাতত বন্ধই হয়ে পড়লো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *