রোজাদার ব্যক্তিদের আরেকটি পুরস্কার হচ্ছে, পরকালে তারা জান্নাতের শ্রেষ্ঠ শ্রেণি সিদ্দিকিন ও শহীদদের  সঙ্গে থাকবেন। হজরত আমর ইবনে মুররা আলজুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যদি এ কথার সাক্ষ্য দিই যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসুল, আর আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি, জাকাত প্রদান করি, রমজান মাসের সিয়াম ও কিয়াম তথা তারাবিসহ অন্যান্য নফল আদায় করি, তাহলে আমি কাদের দলভুক্ত হব? তিনি বললেন, সিদ্দিকিন ও শহীদদের দলভুক্ত হবে। (ইবনে হিব্বান, হাদিস ৩৪৩৮)

রোজা রোজাদারদের জন্য সুপারিশকারী হবে : কেয়ামত দিবসে সবাই যখন নিজ নিজ আমল নিয়ে পেরেশান থাকবেন। তখন রোজাদার ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তাআলা বিশেষ পুরস্কার ও মুক্তির মাধ্যম হিসেবে রোজাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন। বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, রোজা ও কোরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি (অর্থাৎ না ঘুমিয়ে সে তেলাওয়াত করেছে), অতএব, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৬৬২৬)

আল্লাহর কাছে রোজাদারের মুখের গন্ধ সুগন্ধিযুক্ত : রোজাদার ব্যক্তিদের আখেরাতে যেমন অনেক নেয়ামত দ্বারা পুরস্কৃত করা হবে, তেমনি দুনিয়াতেও তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মানসূচক বিশেষ প্রশংসা ও মর্যাদা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।’ (বুখারি, হাদিস ১৯০৪)

জাহান্নাম থেকে মুক্তি : যথাযথ রোজা পালন করার একটি বিশেষ ফজিলত হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে রোজাদার ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমাদের মহান রব ইরশাদ করেছেন, রোজা হলো ঢাল। বান্দা এর দ্বারা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। রোজা আমার জন্য আর আমিই এর পুরস্কার দেব। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৪৬৬৯)

রোজাদারের দোয়া কবুল হয় : রোজাদারের আরেকটি মর্যাদা ও পুরস্কার হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করেন। বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—অর্থাৎ তাদের দোয়া কবুল করা হয়। ১. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। ২. রোজাদার ব্যক্তির দোয়া, ইফতারের সময় পর্যন্ত। ৩. মজলুমের দোয়া। তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং এর জন্য সব আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, আমার ইজ্জতের কসম! বিলম্বে হলেও অবশ্যই আমি তোমাকে সাহায্য করব। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৮০৪৩)

রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত : প্রত্যেক মুমিন বান্দার মুমিনের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে তার প্রভুর সাক্ষাৎ। আর এই সাক্ষাৎ রোজাদারের জন্য তার রোজার কারণে খুব সহজ হবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে, যখন সে আনন্দিত হবে। এক. যখন সে ইফতার করে তখন ইফতারের কারণে আনন্দ পায়। দুই. যখন সে তার রবের সঙ্গে মিলিত হবে তখন তার রোজার কারণে আনন্দিত হবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, যখন সে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে, আর তিনি তাকে পুরস্কার দেবেন, তখন সে আনন্দিত হবে। (বুখারি, হাদিস : ১৯০৪)

রোজার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজেই দেবেন :

একজন রোজাদার ব্যক্তির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বড় পুরস্কার হচ্ছে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করা। এর চেয়ে উত্তম পুরস্কার আর কী হতে পারে? কারণ প্রতিটি নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব ও প্রতিদান রয়েছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোজার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কিন্তু রোজা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।’ (মুসলিম, হাদিস ১১৫১)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমজানের গুরুত্ব বুঝে এই মাসের যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফিক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *